হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিংয়ে ডারউইনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক দিন
স্পোর্টস ডেস্ক, পকেট নিউজ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেই ইতিহাস গড়ার পথে বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনটি যেন পুরোপুরিই বাংলাদেশের পেসারদের দখলে ছিল। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায়।
জবাবে দিনের শেষ সেশনে দারুণ ব্যাটিং করেছে বাংলাদেশ। ২৪ ওভার শেষে ১ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৯৬ রান। ফলে প্রথম দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে মাত্র ১০২ রানে পিছিয়ে থেকে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে সফরকারীরা।
সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় অবশ্যই হাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে শুধু নিজের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংই করেননি, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের প্রথমবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও গড়েছেন তিনি।
শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখে বাংলাদেশ
মারারা স্টেডিয়ামের উইকেটে ঘাসের উপস্থিতি দেখে ম্যাচের আগে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ট্রাভিস হেড জানিয়েছিলেন, পেসারদের জন্য উইকেটে যথেষ্ট সহায়তা থাকতে পারে। সেই সুবিধাটিই দুর্দান্তভাবে কাজে লাগান বাংলাদেশের তিন পেসার হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়া শুরু থেকেই স্বস্তিতে ছিল না। তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদের নতুন বলের আক্রমণে নিয়মিত পরাস্ত হচ্ছিলেন স্বাগতিক ব্যাটসম্যানরা। প্রথম ওভারেই তাসকিনের বলে অস্বস্তিতে পড়েন ট্রাভিস হেড। পরের ওভারেই হাসানের বলে একই পরিস্থিতিতে পড়েন ডারউইনের স্থানীয় ক্রিকেটার জেক ওয়েদারাল্ড।
মাত্র ৭৪ রানেই অস্ট্রেলিয়ার চার উইকেট পড়ে যায়। এরপরও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি প্যাট কামিন্সের দল। দ্বিতীয় সেশনেও বাংলাদেশের পেসারদের সামনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে অস্ট্রেলিয়া। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৩ ওভার ব্যাট করে ১৯৮ রানে অলআউট হয় তারা।
একাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দিলেন হাসান
হাসান মাহমুদের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ধারাবাহিকতা। নিয়মিত ভালো লেংথে বল করার পাশাপাশি দুই দিকেই সুইং করিয়েছেন তিনি। কখনো আবার ব্যাটসম্যানকে শট খেলার প্রলোভন দেখিয়ে ভুল করতে বাধ্য করেছেন।
প্রথম স্পেলে মাত্র ২৫ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন হাসান। এরপর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বোলিং আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। একে একে সাজঘরে ফেরান অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানদের।
তাঁর শিকারদের মধ্যে ছিলেন ট্রাভিস হেড, জেক ওয়েদারাল্ড ও স্টিভ স্মিথ। বিশেষ করে স্মিথের উইকেটটি ছিল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত ২ রানে জীবন পাওয়া স্মিথ শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। ১০৯ বলে ৭১ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও একটি ছক্কা। কিন্তু হাসানকে আক্রমণ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আকাশে ক্যাচ তুলে দিয়ে সাজঘরে ফেরেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক।
৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে হাসান শেষ করেন দিনের সেরা বোলিং। এর মাধ্যমে টেস্টে তৃতীয়বারের মতো পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়লেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন ইতিহাস
হাসানের ৬ উইকেট শুধু ম্যাচের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের প্রথম পাঁচ উইকেট এটি।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে ডারউইনে। অস্ট্রেলিয়ার ১০টি উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান ৬টি, ইবাদত হোসেন ২টি এবং তাসকিন আহমেদ ২টি উইকেট নিয়েছেন।
টেস্টে দ্বিতীয়বারের মতো এক ইনিংসে প্রতিপক্ষের ১০ উইকেটই নেওয়ার কীর্তি গড়লেন বাংলাদেশের পেসাররা। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষেও একই ঘটনা ঘটেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তিদের সামনেই বাংলাদেশের পেস আক্রমণের দাপট
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছে বাংলাদেশ। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ দেখতে ও ধারাভাষ্য দিতে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের একাধিক কিংবদন্তি।
মার্ভ হিউজ, মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, জেসন গিলেস্পি, ম্যাথু হেইডেন ও সাইমন ক্যাটিচদের মতো সাবেক তারকারা ডারউইনের ম্যাচ ঘিরে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের পেসারদের পারফরম্যান্স মুগ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ফাস্ট বোলার মার্ভ হিউজকেও। হাসান মাহমুদের বোলিং সম্পর্কে তাঁর সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন ছিল—‘টু গুড বোলার’। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পেস বোলিং আক্রমণেরও প্রশংসা করেন তিনি।
স্মিথ ছাড়া কেউ দাঁড়াতেই পারেননি
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে স্টিভ স্মিথ ছাড়া কার্যত কেউই বড় প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। জেক ওয়েদারাল্ড ২৩, ট্রাভিস হেড ২২ ও অ্যালেক্স ক্যারি ১৯ রান করেন।
কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস বড় হয়নি। বাংলাদেশের পেসাররা উইকেট থেকে পাওয়া মুভমেন্ট ও বাউন্স কাজে লাগিয়ে স্বাগতিকদের ওপর শুরু থেকেই চাপ ধরে রাখেন।
ইবাদত ও তাসকিনও ছিলেন কার্যকর। দুজনই দুটি করে উইকেট নেন। তাঁদের ধারাবাহিক চাপ হাসানকে আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
ব্যাটিংয়েও ভালো শুরু বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করার পর বাংলাদেশের শুরুটাও অবশ্য পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। ওপেনার তানজিদ হাসান ও সাদমান ইসলাম শুরুতেই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন।
তানজিদ দ্বিতীয় ওভারে জশ হ্যাজলউডের বলে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান। পরের ওভারে সাদমানও মিচেল স্টার্কের বলে আক্রমণাত্মক শট খেলতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়েন।
শেষ পর্যন্ত সাদমান ইসলাম ৩০ বলে ২০ রান করে আউট হন। তবে এরপর অভিজ্ঞ মুমিনুল হক ও তানজিদ হাসান পরিস্থিতি সামলে নেন।
দিন শেষে তানজিদ ৩২ এবং মুমিনুল ৩৫ রানে অপরাজিত ছিলেন। দুজনের অবিচ্ছিন্ন ৬০ রানের জুটি বাংলাদেশকে দারুণ অবস্থানে নিয়ে যায়।
ফলে ২৪ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯৬ রান। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে এখনো ১০২ রান পিছিয়ে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় দিনে নজর ব্যাটসম্যানদের দিকে
প্রথম দিন বাংলাদেশের পেসাররা যে ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন, দ্বিতীয় দিনে সেটিকে বড় লিডে পরিণত করাই হবে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। মুমিনুল হক ও তানজিদ হাসান ইতিমধ্যে উইকেটে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। তাঁদের পাশাপাশি অধিনায়ক ও দলের অন্য ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ব হবে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাট করা।
অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক প্রথম দিনের একমাত্র উইকেটটি নিয়েছেন। তবে জশ হ্যাজলউড, প্যাট কামিন্স ও ক্যামেরন গ্রিন এখনো উইকেটশূন্য। দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সামনে তাঁদের কঠিন পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৯৮
স্টিভ স্মিথ ৭১, জেক ওয়েদারাল্ড ২৩, ট্রাভিস হেড ২২, অ্যালেক্স ক্যারি ১৯।
বাংলাদেশের বোলিং: হাসান মাহমুদ ৬/৫৫, ইবাদত হোসেন ২/৩৯, তাসকিন আহমেদ ২/৫৫।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৪ ওভারে ৯৬/১
মুমিনুল হক ৩৫*, তানজিদ হাসান ৩২*, সাদমান ইসলাম ২০।
অস্ট্রেলিয়ার বোলিং: মিচেল স্টার্ক ১/২৮।
ডারউইনে প্রথম দিনের সারকথা
বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফর শুরু হয়েছে এমন এক পারফরম্যান্স দিয়ে, যা শুধু স্কোরকার্ডে নয়, মানসিকভাবেও সফরকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ‘বিগ থ্রি’—প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডকে নিয়ে গড়া পেস আক্রমণের বিপরীতে বাংলাদেশের হাসান-তাসকিন-ইবাদত ত্রয়ী প্রথম দিনেই দেখিয়ে দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে তাঁরা কতটা কার্যকর হতে পারেন।
হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটের পর এখন বাংলাদেশের সামনে সুযোগ—প্রথম ইনিংসে বড় রান তুলে ডারউইন টেস্টের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া।


0 মন্তব্যসমূহ