আজ বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, পশ্চিম ইউরোপে মহাজাগতিক বিস্ময়; বাংলাদেশ থেকে দেখা যাবে না
বিজ্ঞান ও বিশ্ব ডেস্ক | পকেট নিউজ
১২ আগস্ট ২০২৬
আজ (১২ আগস্ট) বিশ্বের আকাশপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছে এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের আকাশে দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, যা ১৯৯৯ সালের পর এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূর্যগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কোটি কোটি মানুষ এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার প্রস্তুতি নিলেও বাংলাদেশের আকাশে এ গ্রহণ দৃশ্যমান হবে না।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করলে এবং চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটে। এ সময় দিনের আলো সাময়িকভাবে রাতের অন্ধকারে রূপ নেয়, তাপমাত্রা কমে আসে এবং আকাশে তারাও দৃশ্যমান হতে পারে।
২৭ বছর পর ইউরোপে বড় সূর্যগ্রহণ
আজকের সূর্যগ্রহণের পথ (Path of Totality) উত্তর সাইবেরিয়া থেকে শুরু হয়ে আর্কটিক মহাসাগর, পূর্ব গ্রিনল্যান্ড, পশ্চিম আইসল্যান্ড ও উত্তর স্পেন অতিক্রম করবে। এরপর উত্তর-পূর্ব পর্তুগালের একটি ছোট অংশ ছুঁয়ে স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে সূর্যাস্তের সঙ্গে শেষ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৯ সালের পর পশ্চিম ইউরোপে এটিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। ফলে ইউরোপজুড়ে বিজ্ঞানী, পর্যটক ও আকাশপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কোথায় সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দেখা যাবে?
এবারের গ্রহণের সর্বোচ্চ স্থায়িত্ব দেখা যাবে আইসল্যান্ডের পশ্চিমে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর। আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক থেকে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
অন্যদিকে স্পেনের উত্তরাঞ্চলের আ করুনিয়া ও বিলবাও শহরে সূর্যাস্তের ঠিক আগে গ্রহণ শুরু হবে। ইউরোপের অন্যান্য বড় শহর যেমন মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, প্যারিস কিংবা রোমে পূর্ণগ্রাস না হলেও আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
পূর্ণগ্রাস ও বলয়গ্রাস: পার্থক্য কোথায়?
সূর্যগ্রহণ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে—পূর্ণগ্রাস ও বলয়গ্রাস (Annular Eclipse)।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দেয়। ফলে কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো নিভে যায় এবং সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা খালি চোখে দেখা যায়।
অন্যদিকে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণে চাঁদ পৃথিবী থেকে তুলনামূলক দূরে থাকায় আকারে কিছুটা ছোট দেখায়। ফলে সূর্যের মাঝখান ঢেকে গেলেও চারপাশে উজ্জ্বল আলোর বলয় দেখা যায়। এই দৃশ্যকে বলা হয় ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিকুণ্ডলী।
কেন এত বিশেষ এই গ্রহণ?
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর অন্যতম বিরল প্রাকৃতিক ঘটনা। কারণ, চাঁদের প্রচ্ছায়ার সরু পথের মধ্যে থাকা মানুষরাই কেবল এটি দেখতে পারেন।
এ সময়—
দিনের আকাশ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়
তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমে যায়
পাখি ও প্রাণীদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়
সূর্যের করোনা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়
আকাশে উজ্জ্বল গ্রহ ও কিছু তারা দেখা যেতে পারে
বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যের করোনা পর্যবেক্ষণের জন্য পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
নিরাপত্তা সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সূর্যগ্রহণ কখনোই খালি চোখে দেখা উচিত নয়, যদি না সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যায়। সাধারণ সানগ্লাসও যথেষ্ট নিরাপদ নয়।
গ্রহণ দেখার জন্য ব্যবহার করতে হবে—
আন্তর্জাতিক মানের সোলার ইক্লিপস গ্লাস
বিশেষ সৌর ফিল্টারযুক্ত টেলিস্কোপ
নিরাপদ প্রজেকশন পদ্ধতি
অন্যথায় চোখের রেটিনা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে কি দেখা যাবে?
বাংলাদেশের আকাশপ্রেমীদের জন্য কিছুটা হতাশার খবর হলো, আজকের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেশের কোথাও দেখা যাবে না।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রহণের মূল সময় বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য রাতের সময় পড়ছে। অর্থাৎ সূর্য তখন দিগন্তের নিচে অবস্থান করবে।
ভারতীয় সময় অনুযায়ী গ্রহণ শুরু হবে রাত প্রায় ৯টা ৪ মিনিটে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে রাত ১১টা ১৬ মিনিটে। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের কোনো অঞ্চল থেকেই সরাসরি এ দৃশ্য দেখা সম্ভব হবে না।
অনলাইনে দেখার সুযোগ
যদিও বাংলাদেশ থেকে গ্রহণ দেখা যাবে না, তবে আকাশপ্রেমীরা বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থার লাইভ সম্প্রচার দেখতে পারবেন।
বিশেষ করে—
NASA
European Space Agency
এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানমন্দির সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখাবে।
সামনে আসছে আরও কয়েকটি বড় সূর্যগ্রহণ
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী—
২০২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
২০৩০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়।
২০৩৫ সালে জাপানে।
উত্তর আমেরিকায় আবার বড় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ফিরবে ২০৪৪ ও ২০৪৫ সালে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, স্পেন ২০২৬ সালের গ্রহণের পর আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হবে—২০২৭ সালে আরেকটি পূর্ণগ্রাস এবং ২০২৮ সালে একটি বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ।
সংক্ষেপে
আজকের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের জন্য এক ঐতিহাসিক মহাজাগতিক ঘটনা। ২৭ বছর পর এমন দৃশ্য দেখার সুযোগ পাচ্ছেন ইউরোপের মানুষ। যদিও বাংলাদেশ থেকে এটি দেখা সম্ভব নয়, তবুও অনলাইন সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের আকাশপ্রেমীরাও এই বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার সাক্ষী হতে পারবেন।


0 মন্তব্যসমূহ