বন্ধ ও লোকসানি সরকারি কারখানায় বিনিয়োগে ১৪ প্রতিষ্ঠান, ৮৬ প্রস্তাব
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৩ আগষ্ট ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনে ফেরাতে সরকারের উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। এখন পর্যন্ত ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অবকাঠামো, খাদ্য ও পানি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো বিভিন্ন খাত রয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণের পর বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে দেওয়া হতে পারে। এতে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত শিল্পসম্পদ কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪৪টি কারখানা দিয়ে শুরু উদ্যোগ
সরকার গত জুনে রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বেসরকারি খাতে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন ৪৪টি কারখানার তালিকা তৈরি করে।
তালিকায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি, বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাঁচটি এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিডার আহ্বানে প্রাথমিকভাবে চারটি প্রতিষ্ঠান ও ১০টি শিল্পগোষ্ঠী ৮০টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দেয়। পরবর্তী সময়ে আরও প্রস্তাব যুক্ত হওয়ায় মোট প্রস্তাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬টিতে।
একই কারখানায় একাধিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। যেমন, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্যারাগন ও কাজী ফার্মস গ্রুপ। আবার সেতাবগঞ্জ সুগার মিলে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে নাবিল গ্রুপ, ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ এবং মিল্ক ভিটা।
বিনিয়োগের তালিকায় যেসব খাত
বেসরকারি খাতের প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু প্রচলিত শিল্পকারখানা চালুর মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সীমাবদ্ধ নেই। বরং বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন ও আধুনিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ একাই সরকারি ১৬টি কলকারখানার বিপরীতে ৩৫টি প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে অটোমোবাইল সংযোজন, কৃষিশিল্প, নির্মাণসামগ্রী, রেডিমিক্স, পেপার মিল, সৌরবিদ্যুৎ, পাদুকা, আসবাব, পোলট্রি ও ডেইরি খাত রয়েছে।
আকিজ রিসোর্স গ্রুপ দিয়েছে ১২টি এবং টি কে গ্রুপ ১০টি প্রস্তাব। কাজী ফার্মস চারটি এবং ট্রান্সকম গ্রুপ তিনটি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।
আকিজ অ্যাগ্রো অ্যান্ড লাইভ স্টক তিনটি চিনিকলে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সৌরবিদ্যুৎ ও হিমাগার স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েছে। আকিজ ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস হালকা প্রকৌশল, আসবাব, রাবার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
কৃষি ও সৌরবিদ্যুতে আগ্রহ প্যারাগনের
ঠাকুরগাঁও চিনিকলে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে প্যারাগন গ্রুপের। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা পেলে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পশুখাদ্য উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করতে চায়।
এ ছাড়া চিনিকলের আওতাধীন আখ চাষের জমিতে ধান ও ভুট্টা চাষের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
অন্যদিকে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ছোট আকারের হিমাগার স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দ্রুত উৎপাদনে যেতে চায় প্রাণ-আরএফএল
বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে আগে থেকেই শিল্প স্থাপনের উপযোগী জমি ও অবকাঠামো পাওয়া। এ কারণে নতুন করে জমি কিনে কারখানা নির্মাণের তুলনায় সরকারি বন্ধ কারখানার অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার সুযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেসরকারি পর্যায়ে জমি কিনে কারখানা নির্মাণে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। বিপরীতে প্রস্তুত শিল্পজমি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ পাওয়া গেলে অপেক্ষাকৃত দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।
এরই মধ্যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাজশাহী টেক্সটাইল মিল ও রাজশাহী জুট মিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল। দুটি কারখানায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। সম্প্রতি খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসও ইজারা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিনিকল ঘিরে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা
সেতাবগঞ্জ চিনিকল ঘিরেও একাধিক বিনিয়োগকারীর আগ্রহ দেখা গেছে। ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজ দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে সেখানে গবেষণা ও উন্নয়ন, ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, জৈব সার, বীজ ও আলু বর্ধন, হিমাগার এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে।
নাবিল গ্রুপ রাজশাহী ও সেতাবগঞ্জ চিনিকলে সুগারবিট, সমন্বিত কৃষি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
মিল্ক ভিটা সেতাবগঞ্জ চিনিকলে দৈনিক ৩০ হাজার লিটার উৎপাদনক্ষম একটি আধুনিক রিফাইনারি স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে ডেটা অবকাঠামো
সরকারি শিল্পকারখানাগুলোকে নতুন প্রজন্মের শিল্পে রূপান্তরের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোতে। টি কে গ্রুপ সরকারি কারখানার দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নিয়ে অটোমোবাইল যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন, চামড়ার জুতা ও সৌরবিদ্যুতের গ্লাস উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে।
এক্সিলেন্ট সিরামিকস গ্রুপ বৈদ্যুতিক গাড়ি সংযোজন, ব্যাটারি সিস্টেম, প্রকৌশল, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও টেবিলওয়্যার উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে চায়।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ভবিষ্যতমুখী খাতও রয়েছে।
নীতিমালা চূড়ান্ত হলেই নির্ধারিত হবে কোন মডেলে দেওয়া হবে
সরকারি বন্ধ ও লোকসানি কারখানাগুলো কীভাবে বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য মডেলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, মুনাফা ভাগাভাগি এবং অন্যান্য অংশীদারত্বের ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে।
শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান জানিয়েছেন, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬’ অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে সরকারি বন্ধ ও অলাভজনক কারখানা কোন মডেলে বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত হবে।
বিডার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে নীতিমালা অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শিল্পকারখানা যেন আবাসন প্রকল্পে পরিণত না হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বন্ধ কারখানা বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়নে কঠোর শর্ত থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্পের জন্য প্রতিষ্ঠিত জমি যেন পরবর্তী সময়ে আবাসন বা অন্য কোনো অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পরও এসব প্রতিষ্ঠানকে শিল্পকারখানা হিসেবে ধরে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও সুনাম যাচাই করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হবে।
কারণ, অতীতে সরকারি শিল্পকারখানার জমি ইজারা নিয়ে আবাসন প্রকল্পসহ শিল্পবহির্ভূত কাজে ব্যবহারের নজির রয়েছে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো চালু হলে একদিকে যেমন সরকারের অব্যবহৃত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার হবে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অটোমোবাইল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও হালকা প্রকৌশলের মতো খাতে বিনিয়োগ হলে দেশের শিল্পের বহুমুখীকরণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। কারখানাগুলোর প্রকৃত অবস্থা, জমির ব্যবহার, অবকাঠামো, পরিবেশগত ঝুঁকি, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের অচল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসম্পদকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে—সঠিক বিনিয়োগকারী নির্বাচন, কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং এসব কারখানাকে সত্যিকার অর্থেই শিল্প ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা।


0 মন্তব্যসমূহ