সন্ধ্যা থেকেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা, এলএনজি পেতে চলছে নানা উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ১২ আগস্ট ২০২৬
দেশে চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবের মধ্যে আজ সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সংকট মোকাবিলায় সরকার এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য এরই মধ্যে একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ার আশা করছেন তারা।
সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি উন্নতির আশা
চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গতকাল সন্ধ্যা থেকেই একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে এবং তার প্রভাব আজ সন্ধ্যা থেকে কিছুটা দেখা যেতে পারে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ এবং গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য এসেছে।
তবে তিনি এমন কোনো নিশ্চয়তা দেননি যে সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে। বরং ‘কিছুটা হলেও’ পরিস্থিতির উন্নতির আশা প্রকাশ করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি এবং বিদ্যুৎ খাতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে।
এলএনজি পেতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা
গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, অন্তত এক কার্গো এলএনজি পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ।
তবে বিকল্প হিসেবে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইএসও ট্যাংক সহজলভ্য না থাকায় প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারের হাতে থাকা যতগুলো বিকল্প রয়েছে, সবগুলো নিয়েই কাজ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে
এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হওয়ায় বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
‘জনদুর্ভোগ বিবেচনায় প্রাণান্তকর চেষ্টা চলছে’
চলমান সংকটে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টিও স্বীকার করেছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জনগণ সরকারের কাছ থেকে সংকট সম্পর্কে পরিষ্কার বার্তা জানতে চায়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষায়, জনদুর্ভোগ বিবেচনায় সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে এবং তাদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই—এমনটাই জনগণ বুঝবেন বলে তিনি আশা করেন।
এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, রান্না এবং পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিকে দায়ী করলেন প্রতিমন্ত্রী
বর্তমান সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অতীতের জ্বালানি নীতির সমালোচনাও করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, ভুল নীতি গ্রহণ করলে একসময় তার মাশুল দিতে হয়। তার দাবি, আগের সরকারগুলো কোনো মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সূত্র খুঁজে বের করেনি। বরং তাৎক্ষণিক সমাধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে গেছে।
তার মতে, বর্তমান সংকট আজ না হলে আগামীকাল কিংবা পরশু দেখা দিত। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে কোনো একসময় দেশকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হতো।
সংকটের কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায়ও চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় দ্রুত তার প্রভাব পড়ে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্রিডের ওপর। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানেও সরবরাহ কমে যায়।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করা শুধু গ্যাস সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর সন্ধ্যার পরিস্থিতির দিকে
সরকারের নেওয়া কৌশলের ফলে আজ সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরও পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট এড়াতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, এলএনজি আমদানি অবকাঠামো, জ্বালানি মজুত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎস নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, আজ সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশ্বাস মিললেও সংকট পুরোপুরি কাটতে এখনো সময় লাগতে পারে। এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগ এবং গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতিই ঠিক করবে আগামী কয়েক দিনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কতটা স্বস্তি পাবে।


0 মন্তব্যসমূহ