আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে ‘উত্তরাধিকার’, নতুন আয়োজনে ফিরছে ২০ জনপ্রিয় গান
বিনোদন প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ১৫ আগষ্ট ২০২৬
বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও গিটার জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু নেই প্রায় আট বছর। তবে তাঁর গান, সুর, কণ্ঠ ও গিটারবাদনের অনন্য উত্তরাধিকার এখনো সমানভাবে বেঁচে আছে শ্রোতাদের হৃদয়ে। সেই উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দিতে এবার আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ সংগীত প্রকল্প ‘উত্তরাধিকার’।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন ১৬ আগস্ট উপলক্ষে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এই বিশেষ অ্যালবাম। এতে তাঁর গাওয়া শ্রোতাপ্রিয় ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করেছেন দেশের ৮টি ব্যান্ড ও একাধিক একক শিল্পী। ডাবল সিডির পাশাপাশি গানগুলো প্রকাশিত হবে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রকল্প থেকে পাওয়া অর্থ ব্যয় করা হবে আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম তৈরির কাজে। ফলে ‘উত্তরাধিকার’ শুধু একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি অ্যালবাম নয়; এটি প্রয়াত শিল্পীর স্মৃতি ও সৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের একটি উদ্যোগও।
নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে আইয়ুব বাচ্চুর গান
‘রুপালি গিটার’, ‘নীল বেদনা’, ‘মাধবী’, ‘সেই তুমি’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘এখন অনেক রাত’—আইয়ুব বাচ্চুর দীর্ঘ সংগীতজীবনে তৈরি অসংখ্য গান বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে আজও বিশেষ আবেগের নাম।
‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্পে সেই গানগুলোর মধ্য থেকে ২০টি গান বেছে নিয়ে নতুন করে সংগীতায়োজন করা হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে দলছুট, আরবোভাইরাস, সোনার বাংলা সার্কাস, শুভযাত্রা, ক্যালিপসো, রকসল্ট, ডোপামিন ও এ কে রাহুল।
একক শিল্পীদের মধ্যেও রয়েছেন বাবনা করিম, রাসেল আলী, রোমেল আলী, চন্দন জামান আলী-মেনন, কানিজ সুবর্ণা, সাজ্জাদ, পলাশ, জয় শাহরিয়ার, অদিত, বখতিয়ার হোসেন, আতিকা ইয়ামিন, অটামনাল মুনসহ আরও কয়েকজন শিল্পী। সব গান মাস্টারিং করেছেন ইকবাল আসিফ জুয়েল।
অর্থাৎ, আইয়ুব বাচ্চুর গানকে শুধু পুরোনো স্মৃতি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে না; বরং বর্তমান সময়ের শিল্পীদের কণ্ঠ ও সংগীতচিন্তার মধ্য দিয়ে সেগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
কোন শিল্পী গাইছেন কোন গান?
অ্যালবামের গানগুলোর তালিকাতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। দলছুট গেয়েছে ‘রুপালি গিটার’, আরবোভাইরাস পরিবেশন করেছে ‘নীল বেদনা’, আর সোনার বাংলা সার্কাস গেয়েছে ‘গতকাল রাতে’।
এ ছাড়া শুভযাত্রা গেয়েছে ‘চলো বদলে যাই’, ক্যালিপসো ‘চাঁদ মামা’, রকসল্ট ‘অচেনা জীবন’, ডোপামিন ‘মাধবী’ এবং এ কে রাহুল গেয়েছেন ‘মন চাইলে মন’।
একক শিল্পীদের পরিবেশনায় থাকছে ‘হাসতে দেখো’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘মেয়ে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘আপন কেহ নাই’, ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘রাতের তারা’, ‘ফেরারি এই মন’, ‘হকার’, ‘নীরবে’ ও ‘বাংলাদেশ’সহ জনপ্রিয় গান।
এ তালিকা থেকেই বোঝা যায়, প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো নয়; আইয়ুব বাচ্চুর বিভিন্ন সময়ের গানকে নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিত করে তোলা।
‘চলো বদলে যাই’ নিয়ে শুভযাত্রার আবেগ
আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘চলো বদলে যাই’ নতুন করে গেয়েছে ব্যান্ড শুভযাত্রা। ব্যান্ডটির ভোকাল শুভর কাছে কাজটি ছিল একই সঙ্গে আনন্দের ও আবেগের।
তিনি জানান, আইয়ুব বাচ্চুর গান আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে করার প্রস্তাব পাওয়ার পর কিছুটা ভয়ও কাজ করেছিল। কারণ, বাচ্চুর গান সাধারণভাবে কাভার করা এবং এমন একটি বড় প্রকল্পের অংশ হিসেবে গানটি নতুন সংগীতায়োজনে করা—দুটি বিষয় এক নয়।
শেষ পর্যন্ত টানা কয়েক দিন কাজ করে গানটির নতুন সংগীতায়োজন তৈরি করে শুভযাত্রা। তাঁদের প্রত্যাশা, শ্রোতারা নতুন আয়োজনটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন।
শুধু অ্যালবাম নয়, লক্ষ্য আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম
‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম তৈরির পরিকল্পনা।
গিটার ছিল আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পীসত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি নামী ব্র্যান্ডের গিটার সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর সংগ্রহে থাকা ফেন্ডার স্ট্রাটোকাস্টার, আইভানেজ জেম সেভেন্টি সেভেনসহ প্রায় ৫০টি গিটার বর্তমানে পরিবারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর ব্যবহৃত ক্যাপ, টি-শার্ট, এবি কিচেনের বিভিন্ন সরঞ্জামসহ নানা স্মারকও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
পরিবার ও আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা—এসব স্মারক এক জায়গায় এনে এমন একটি মিউজিয়াম বা মিউজিক্যাল লাউঞ্জ তৈরি করা, যেখানে দর্শক ও সংগীতপ্রেমীরা আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পীজীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে আরও কাছ থেকে পরিচিত হতে পারবেন।
যত্নে সংরক্ষিত হচ্ছে গিটারগুলো
আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ও আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফেরদৌস আক্তার দীর্ঘদিন ধরে তাঁর স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশেষ করে গিটারগুলো সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ও পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিন সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে কাঠ, ধাতব অংশ ও অন্যান্য উপকরণে তৈরি বাদ্যযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পরিবারের পক্ষ থেকে এর আগেও আইয়ুব বাচ্চুর কয়েকটি গিটার নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগ থেকেই বোঝা যায়, ভবিষ্যতে স্থায়ী একটি মিউজিয়াম তৈরির পরিকল্পনাটি কেবল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ধীরে ধীরে তার বাস্তবায়নের পথও তৈরি হচ্ছে।
আট বছর পরও প্রাসঙ্গিক আইয়ুব বাচ্চু
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর, ৫৬ বছর বয়সে মারা যান আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তাঁর প্রভাব কমেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, তাঁর গান ও গিটারবাদন নতুন প্রজন্মের কাছেও নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে।
তাঁর গানের বিশেষত্ব ছিল—রক সংগীতের শক্তিশালী উপস্থাপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, জীবনসংগ্রাম ও নাগরিক বাস্তবতাকে মিশিয়ে দেওয়া। ফলে তাঁর গান একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের মধ্যে আটকে থাকেনি।
‘সেই তুমি’ কিংবা ‘চলো বদলে যাই’-এর মতো গান যেমন শ্রোতাদের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নেয়, তেমনি ‘রুপালি গিটার’ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংস্কৃতির অন্যতম প্রতীকী গান।
এই কারণেই তাঁর গান নতুন শিল্পীদের কণ্ঠে নতুন সংগীতায়োজনে ফিরে আসার বিষয়টি কেবল একটি অ্যালবাম প্রকাশের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর উত্তরাধিকারকে নতুন করে সামনে আনার উদ্যোগ।
স্বপ্ন পূরণের পথে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন। ২০২০ সালে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা চলছে আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি, গান, গিটার এবং অন্যান্য সৃষ্টিশীল কাজকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার। তবে এ ধরনের বড় উদ্যোগ বাস্তবায়নে পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্প সেই জায়গায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ অ্যালবামটি থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি মিউজিয়াম তৈরির কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির সমন্বয়ক চিশতি ইকবাল জানান, আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে বিশেষ কিছু করার ইচ্ছা থেকেই প্রাথমিকভাবে কয়েকটি গান নতুন করে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরে আলোচনা করে ২০টি গান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্প তৈরি করা হয়।
১৬ আগস্ট প্রকাশ, সামনে নতুন অধ্যায়
আগামী ১৬ আগস্ট, আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে ‘উত্তরাধিকার’ অ্যালবাম প্রকাশ করা হবে। একই দিন এ প্রকল্প নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। ডাবল সিডির পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও গানগুলো প্রকাশিত হবে।
ফলে একদিকে নতুন সংগীতায়োজনে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গানগুলো আবার শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাবে, অন্যদিকে এই উদ্যোগ থেকে পাওয়া অর্থ তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন—একটি মিউজিয়াম তৈরির পথকে আরও এগিয়ে নেবে।
আইয়ুব বাচ্চুর গান হয়তো তাঁর কণ্ঠে আর নতুন করে শোনা যাবে না। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকে নতুন শিল্পীরা নতুনভাবে পরিবেশন করছেন, তাঁর গিটারগুলো যত্নে সংরক্ষিত হচ্ছে এবং তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে স্থায়ী সংগ্রহশালার পরিকল্পনা। সেই অর্থে ‘উত্তরাধিকার’ শুধু ২০টি গানের অ্যালবাম নয়—এটি একজন কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকারকে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস।


0 মন্তব্যসমূহ