মিরপুরে ‘মামুন বাহিনী’র বিস্তৃতির অভিযোগ, জমি দখল-চাঁদাবাজি-খুনসহ নানা অপরাধের অভিযোগ
পকেট নিউজ প্রতিবেদন | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, বস্তির ঘর থেকে ভাড়া আদায়সহ নানা অপরাধের অভিযোগে কয়েকটি অপরাধী দলের নাম আলোচনায় এসেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এসব দলের মধ্যে একটি হলো ‘মামুন বাহিনী’। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুন। তিনি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে মামুনের দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমানের নামও বাহিনীটির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মশিউর রহমান। তিনি বলেছেন, জমি নিয়ে কোনো পক্ষ বৈধ কাগজপত্র নিয়ে এলে তাঁরা সহযোগিতা করেন এবং চাঁদাবাজি বা অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সত্য নয়।
প্রায় ২৫ কোটি টাকার জমি দখলের অভিযোগ
মিরপুরের পল্লবী থানার আওতাধীন বাইগারটেক এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর প্রায় ২৮ কাঠা জমি রয়েছে। জমিটির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর এবং ভেতরে পাঁচটি টিনের ঘর ছিল। এসব ঘর ভাড়া দেওয়া হতো।
মোহাম্মদ আলীর দাবি, গত ৩০ এপ্রিল রাতে একদল ব্যক্তি বুলডোজার দিয়ে তাঁর জমির সীমানাপ্রাচীর ও ঘরগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর জমিটি দখলে নেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জমিটির আনুমানিক মূল্য ২৫ কোটি টাকা। তিনি আরও দাবি করেন, মশিউর রহমান তাঁকে ফোন করে জমিতে যেতে নিষেধ করেছেন।
তবে মশিউর রহমান জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জমি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধ থাকতে পারে। বৈধ নথিপত্র নিয়ে কেউ এলে তাঁরা সহযোগিতা করেন।
মিরপুরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। পল্লবীতে জমি কেনাবেচা বা নির্মাণকাজ শুরু করার পর অর্থ দাবির অভিযোগ নিয়েও পুলিশে অভিযোগ জমা পড়েছে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ ‘মামুন বাহিনী’র বিরুদ্ধে আবাসন প্রতিষ্ঠান, বাজার, ফুটপাত, বস্তি ও পোশাক কারখানা থেকে অর্থ আদায় এবং ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের কথা জানিয়েছে।
চারটি অপরাধী দলের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি অপরাধী দলের প্রভাব রয়েছে। এসব দলের মধ্যে মামুন বাহিনী ছাড়াও ইব্রাহিম, শাহাদত ও মোক্তার নামের ব্যক্তিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর কথা বলা হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইব্রাহিম ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে মিরপুর-১৩, মিরপুর-১৪, ভাষানটেক ও কালশী এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। শাহাদত ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে মিরপুর-১, মিরপুর-২ ও মিরপুর-৬ এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মোক্তার ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ এলাকার কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
মামুনের ক্ষেত্রে পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের কথা বিভিন্ন সূত্রে এসেছে। অন্যান্য সংবাদ প্রতিবেদনেও মামুনের বিদেশে অবস্থান করে পল্লবী এলাকার অপরাধজগতের ওপর প্রভাব রাখার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
পুরোনো মামলা ও বিদেশে অবস্থানের তথ্য
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মফিজুর রহমান মামুনের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মামলা হয়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল, তাঁর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় চাঁদাবাজি, হত্যা, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার ও ডাকাতির অভিযোগে একাধিক মামলা এবং গ্রেপ্তারি ও সাজা পরোয়ানা ছিল।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামুন এর আগে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন। পরে বাংলাদেশে ফিরে গ্রেপ্তার হলেও জামিনের পর আবার বিদেশে চলে যাওয়ার কথা পুলিশ সূত্রে বলা হয়েছে।
তবে এসব মামলার সবগুলোর বিচারিক ফলাফল একই পর্যায়ে রয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে আদালতের নথি দেখে যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে মামলার অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পোশাক কারখানা ও ঝুট ব্যবসা ঘিরেও অভিযোগ
মিরপুর এলাকায় ছোট-বড় বহু পোশাক কারখানা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মামুন বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা কিছু কারখানা থেকে নিয়মিত অর্থ দাবি করা হয় এবং কারখানার ঝুট ব্যবসার ওপরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়।
স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, একটি পোশাক কারখানার ঝুট বিক্রির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ নিয়ে বিরোধের সময় কারখানার সামনে বিস্ফোরক ফোটানোর অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে পল্লবীর এ কে বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানে হামলা ও গুলির ঘটনায় পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছিল। পুলিশ তখন হামলার ঘটনায় অর্থ দাবির বিষয়টি জানিয়েছিল। এ ঘটনার সঙ্গে মামুনের নামও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যা মামলায়ও নাম
মিরপুরের অপরাধজগতের আলোচনায় মামুন বাহিনীর নাম আরও জোরালোভাবে আসে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের পর।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মিরপুর-১২ এলাকায় একটি দোকানে ঢুকে গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে র্যাব এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। ২০২৬ সালের মার্চে দুই শুটারকে গ্রেপ্তারের কথাও জানায় র্যাব এবং তাঁদের কাছ থেকে বিদেশি রিভলবার ও গুলি উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। পুলিশের একটি সূত্র মামুন বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা বললেও র্যাবের এক পর্যায়ের বক্তব্যে হত্যার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে অন্য একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ মামলাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
এ কারণে গোলাম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত দায় কার ওপর বর্তায়, তা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ
মামুন বাহিনীর পাশাপাশি পল্লবী এলাকায় কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার কথাও পুলিশ সূত্রে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ‘ভইরা দে গ্রুপ’ ও ‘বাহুবলী গ্রুপ’ নামের দুটি দলের কথা বলা হয়েছে।
পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, এসব দলের সঙ্গে স্থানীয় আধিপত্য ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন বা মহড়ার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কথাও জানা গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কোনো এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধী দল, কিশোর গ্যাং এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পর্ক থাকলে তদন্তে ব্যক্তির দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অপরাধ ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মিরপুরের সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতি
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগে গত কয়েক বছরে হত্যা, চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির একাধিক মামলা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী সময়ে মিরপুর এলাকায় হত্যা, চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা হয়েছে। তবে অপরাধের সব ঘটনা থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ডিএমপি কর্মকর্তারা এর আগে বলেছেন, মিরপুর অঞ্চলের অপরাধীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। বিদেশে অবস্থানকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়ার কথাও পুলিশ জানিয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধের অভিযোগ
মিরপুরের এসব ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগে যেসব ব্যক্তির নাম আসছে, তাঁদের কারও কারও সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের পদ বা পরিচয়ের সম্পর্ক রয়েছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় থাকা নিজেই অপরাধের প্রমাণ নয়। ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণিত হলে আইন ও দলের নিজস্ব সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলাদা।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও বলেছেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধী চক্রকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তাদের অর্থের উৎস, সহযোগী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র সরবরাহ, মাদক ও চাঁদাবাজির কাঠামো এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী আশ্রয়ের অভিযোগ—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
মিরপুরের জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগগুলো তাই শুধু ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় অপরাধচক্র কীভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব তৈরি করে—সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধে আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মূল পথ।


0 মন্তব্যসমূহ