আশুলিয়ায় বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া সিলিন্ডার টিনের চালা ভেদ করে পড়ল দোকানে, মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাভারের আশুলিয়ার জামগড়ায় গ্যাসভর্তি কাভার্ড ভ্যানে ভয়াবহ বিস্ফোরণের এক দিন পর ঘটনাস্থলের আশপাশে ছড়িয়ে পড়া সিলিন্ডার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিস্ফোরণের সময় একটি সিলিন্ডার ছিটকে গিয়ে পাশের একটি খাবারের দোকানের টিনের চালা ভেদ করে নিচে পড়ে। পরে স্থানীয়রা সিলিন্ডারটি উদ্ধার করে দেখতে পান, সেটির গায়ে এমন একটি ইংরেজি লেখা রয়েছে, যার অর্থ অনুযায়ী ২০২১ সালের পর সেটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা ছিল।
রোববার রাতে জামগড়ার প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বরে সিলিন্ডারবাহী একটি কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে সাতজন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ঘটনার পরদিন সোমবার দুপুরে বিস্ফোরণের সময় ছিটকে যাওয়া একটি সিলিন্ডার পাশের রানা হোটেলের টিনের চালা ভেদ করে নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিলিন্ডারটির গায়ে থাকা তথ্য নিয়েই এখন এর নিরাপত্তা ও ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এটি বিস্ফোরণের মূল কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিস্ফোরণে সিলিন্ডার ছিটকে গিয়ে পড়ে দোকানে
সোমবার বেলা দুইটার দিকে জামগড়া এলাকার রানা হোটারের টিনের চালার নিচে সিলিন্ডারটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় লোকজন সেটি দেখতে সেখানে ভিড় করেন।
রানা হোটেলের মালিক মো. হালিম জানান, রোববার রাতে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তাঁরা। শব্দের পরপরই চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কিছু সময়ের জন্য সামনে কী ঘটছে, তা দেখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
হালিমের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের সময় একটি সিলিন্ডার ছিটকে এসে তাঁর ছেলের মাথায় আঘাত করে। আঘাতের পর তাঁর ছেলে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যায়। পরে আশপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। আরও একটি সিলিন্ডার পাশের একটি দোকানে গিয়ে পড়ে।
আহত ছেলেকে রাতে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান হালিম। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মাথায় আঘাতের গুরুতর কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে চিকিৎসক সিটিস্ক্যান করানোর পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
সিলিন্ডারে ২০২১ সালের পর ব্যবহার না করার নির্দেশনা
ঘটনাস্থলে পাওয়া সিলিন্ডারটির গায়ে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে—‘অ্যাপ্রোভড পিআরডি সিএনজি অনলি ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’। সহজভাবে এর অর্থ দাঁড়ায়, এটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থার অনুমোদিত সিএনজি সিলিন্ডার এবং ২০২১ সালের পর এটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা রয়েছে।
সিলিন্ডারের গায়ে থাকা এই তথ্য থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, নির্ধারিত সময়ের পরও সিলিন্ডারটি কীভাবে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল এবং বিস্ফোরণের ঘটনায় এর কোনো ভূমিকা ছিল কি না।
তবে শুধু গায়ে লেখা তথ্যের ভিত্তিতে সিলিন্ডারটি বিস্ফোরণের কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সিলিন্ডারের প্রকৃত অবস্থা, ব্যবহারকাল, রক্ষণাবেক্ষণ, পরীক্ষার ইতিহাস এবং বিস্ফোরণের সময় এর অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে তবেই প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব।
‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ কি না, তদন্তেই জানা যাবে
ঘটনাস্থলে আসা আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনকে স্থানীয় কয়েকজন সিলিন্ডারটি দেখান। সিলিন্ডারের গায়ে থাকা তথ্যের বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হয়।
মহিবুল্লাহ আকন বলেন, কয়েকজন তাঁকে একটি সিলিন্ডার দেখিয়েছেন। সেটির গায়ে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে সিলিন্ডারের ভেতরে থাকা গ্যাসের মেয়াদ শেষ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাই বলতে পারবেন।
এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ঘটনাস্থলে পাওয়া সিলিন্ডারটির গায়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর ব্যবহার না করার নির্দেশনা থাকলেও সেটি বিস্ফোরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল কি না, তা এখনো তদন্তের বিষয়।
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি
বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন জানান, তদন্তের পরই বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি বলেন, সিলিন্ডারটি নির্ধারিত সময়ের পর ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।
অর্থাৎ তদন্তে শুধু বিস্ফোরিত কাভার্ড ভ্যান বা সিলিন্ডারের অবস্থাই নয়, সিলিন্ডারের ব্যবহারযোগ্যতা, নিরাপত্তা পরীক্ষা, সংরক্ষণ ও পরিবহনের নিয়ম মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত ৭, আহত অন্তত ২৫
রোববার রাতে প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বরে গ্যাসভর্তি কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনাস্থলে আতঙ্ক তৈরি হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। বিস্ফোরণের ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কাভার্ড ভ্যানের সিলিন্ডার বা বিভিন্ন অংশ আশপাশের এলাকায় ছিটকে পড়েছে। এরই একটি সিলিন্ডার পাশের খাবারের দোকানের টিনের চালা ভেদ করে নিচে পড়ে থাকার বিষয়টি ঘটনার ভয়াবহতার মাত্রা তুলে ধরছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন সামনে
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
বিশেষ করে কোনো সিলিন্ডারের গায়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর ব্যবহার না করার নির্দেশনা থাকলে সেটি পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না এবং পরিবহনের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের সময় এত দূরে ছিটকে গিয়ে পাশের স্থাপনার টিনের চালা ভেদ করে পড়ার ঘটনা গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার পরিবহনের ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
তদন্তের ফলের অপেক্ষা
আশুলিয়ার জামগড়ার এই বিস্ফোরণে প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হয়েছেন। ঘটনার পরদিন বিস্ফোরণে ছিটকে যাওয়া সিলিন্ডার উদ্ধার হওয়া এবং সেটির গায়ে ২০২১ সালের পর ব্যবহার না করার নির্দেশনা পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সিলিন্ডারটির মেয়াদ, বিস্ফোরণের কারণ কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। চার সদস্যের তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে সিলিন্ডারটির অবস্থা, বিস্ফোরণের কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার কথা।
তদন্তের ফল প্রকাশের পরই জানা যাবে, বিস্ফোরণের পেছনে সিলিন্ডারের কোনো কারিগরি বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি ছিল কি না এবং নির্ধারিত সময়ের পর ব্যবহার না করার নির্দেশনা থাকা কোনো সিলিন্ডার ঘটনাস্থলে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।


0 মন্তব্যসমূহ