পারমাণবিক শক্তির যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু
নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
বাঙালির গর্ব আর সক্ষমতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো পাবনার রূপপুরে। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার বিকেলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে (Reactor Vessel) পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের অভিজাত তালিকায় নাম লেখালো বাংলাদেশ।
ঐতিহাসিক মুহূর্তের উদ্বোধন
বিকেলে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অতিথিরা স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে জ্বালানি লোডিংয়ের শুভ সূচনা করেন। মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন,
"আজ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের অংশ হলো। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু পাবনা নয়, সারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিপ্লব ঘটাবে।"
বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং চূড়ান্ত ধাপ। চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম বসানোর ফলে সেখান থেকে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পীভূত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট মাস থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
অনুষ্ঠানে দেশি-বেদেশি অতিথিবৃন্দ
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশকে এই অর্জনে অভিনন্দন জানান।
প্রকল্পের নেপথ্যে
দেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২টি ইউনিটের নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর: রূপপুরে পারমাণবিক জ্বালানি আসার পর স্থাপনাটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর: রাশিয়া থেকে আকাশপথে প্রথম চালানের ইউরেনিয়াম ঢাকায় পৌঁছায়। আজ ২৮ এপ্রিল, ২০২৬: শুরু হলো সেই জ্বালানির ব্যবহার।
নিরাপত্তার চাদরে রূপপুর
জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পুরো প্রকল্প এলাকা এবং এর আশপাশে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশেষায়িত বাহিনীর সদস্য এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই সংবেদনশীল কাজটির প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক নতুন আশার আলো। সাশ্রয়ী এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

0 মন্তব্যসমূহ