সুনামগঞ্জে প্রকৃতির তাণ্ডব: ঢল ও বৃষ্টিতে ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন, দিশাহারা হাওরবাসী
নিজস্ব প্রতিবেদক| ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল সোনালি বোরো ফসল। বাঁধ ভেঙে ও বৃষ্টির পানিতে ধান ডুবে যাওয়ায় কৃষকের হাহাকারে ভারী হয়ে উঠেছে হাওরের আকাশ।
২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড বৃষ্টিপাত ও ঢল
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সাথে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় উজান থেকে আসা ঢল সুরমা নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি বেড়েছে অন্তত ৩৫ সেন্টিমিটার।
বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ
পাহাড়ি ঢলের প্রবল চাপে জেলার বিভিন্ন স্থানে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ছে:
মধ্যনগর: ইকরাছই হাওরের একটি স্থানীয় বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ ফসল তলিয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ সদর: দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে ফসলি জমিতে।
বিশ্বম্ভরপুর: করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে পানি ঢোকার উপক্রম হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, মাটি দিয়ে তৈরি এসব বাঁধ টানা বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাওয়ায় এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ধান কাটার চিত্র ও সংকট
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এবার ১শ' ৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪৪ শতাংশ (৯৯,৪৮৩ হেক্টর) জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি ফসল এখনো মাঠে। ভারী বৃষ্টির কারণে হাওরে হারভেস্টার মেশিন চালানো যাচ্ছে না, আবার তীব্র শ্রমিক সংকটে আধা-কাঁচা ধানও ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। অনেক কৃষক খলাতে (ধান শুকানোর স্থান) রাখা ধানও বৃষ্টির পানিতে হারিয়েছেন।
কৃষকের হাহাকার
জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরপাড়ের কৃষক সারদা চরণ দাস আক্ষেপ করে বলেন,
"কাল দিনেও পাকা ধান দেখে গিয়েছিলাম, আজ সকালে এসে দেখি সব পানির নিচে।
১৬ বিঘার মধ্যে মাত্র ৪ বিঘা তুলতে পেরেছি, বাকি সব শেষ।"
অনুরূপ পরিস্থিতি দিরাইয়ের কাইমা, জামালগঞ্জের হালির হাওর এবং শান্তিগঞ্জের খাই হাওরসহ জেলার প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই। অনেক কৃষক বজ্রপাত ও বৃষ্টির আতঙ্ক মাথায় নিয়ে নামমাত্র মজুরিতেও শ্রমিক না পেয়ে পরিবার নিয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
প্রশাসনের সতর্কতা ও নজরদারি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান প্রতিটি প্রকল্পের (পিআইসি) লোকজনকে বাঁধে পাহারার নির্দেশ দিয়েছেন। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন, তবে মাটির বাঁধ হওয়ায় প্রবল ঢল সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
আগামী দুই দিন অতি গুরুত্বপূর্ণ
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ ও চেরাপুঞ্জিতে আরও অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তা ও গবেষকরা বলছেন, এই দুই দিন যদি বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটে, তবে হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে ততক্ষণে কৃষকের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে।
নিউজ বুলেটিন: সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান (৮০ শতাংশ পাকলে) কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে স্থানীয়দের বাঁধ রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ