ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: ওয়াশিংটনের ‘সামরিক সাফল্যের’ বড়াই বনাম বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৫ মে, ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী কতটা সফল, তা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২৬ মার্চ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ টেলিভিশনে প্রচারিত এক বৈঠকে দাবি করেছিলেন যে, ইতিহাসে কখনো কোনো দেশের সামরিক বাহিনীকে এত দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। তবে এর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ওয়াশিংটনের সেই দাবি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
সামরিক সরঞ্জামের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংস্থাটির হিসাব মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানের হামলা এবং নিজেদের মধ্যে হওয়া ভুলবশত সংঘর্ষে (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৩০ কোটি থেকে ২৮০ কোটি ডলার।
উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তালিকা:
ই-৩ অ্যাওয়াকস/ই-৭ রাডার বিমান: গত ২৭ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলায় ধ্বংস হয় এই উড়ন্ত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রটি, যার মূল্য প্রায় ৭০ কোটি ডলার।
থাড (THAAD) রাডার: হাইপারসনিক হুমকি শনাক্তকারী অন্তত একটি (মতান্তরে দুটি) শক্তিশালী রাডার ধ্বংস হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৯৭ কোটি ডলার।
এফ-১৫ যুদ্ধবিমান: মার্চ মাসের শুরুতে কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর শিকার হয়ে তিনটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।
তথ্যের গোপনীয়তা ও স্যাটেলাইট সীমাবদ্ধতা
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র পাওয়া এখন সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। মার্কিন সরকারের অনুরোধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্ল্যানেট ল্যাবস তাদের স্যাটেলাইট ছবি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সিএসআইএস ইরানের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে মার্কিন ঘাঁটির ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে।
কৌশলগত পরাজয়ের আশঙ্কা
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক ওমর আশুর মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে জয়ী হলেও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। তিনি ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের উদাহরণ টেনে বলেন, রাজনৈতিক কারণে ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে চাইছে না, যা আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।
“ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জিতেছিল, কিন্তু সবশেষে তাদের কৌশলগত পরাজয় হয়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে মার্কিন সেনা ২০০৩ সালের তুলনায় ১০ ভাগের ১ ভাগও নয়।” — ওমর আশুর, সামরিক বিশ্লেষক।
হরমুজ প্রণালি ও নৌবাহিনীর চ্যালেঞ্জ
সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ান জানান, হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে না পারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় শিক্ষা। যুদ্ধের শুরুতেই ইরান এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা সংকটে পড়েছে। যদিও গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করার পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে, তবুও মার্কিন নৌবাহিনী এই মুহূর্তে বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের সক্ষমতা
অধ্যাপক আশুরের মতে, মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণে ইরানের প্রথাগত সামরিক কাঠামো দুর্বল হলেও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গোলাবারুদ মজুত পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে তাদের নৌবাহিনী দুর্বল হলেও এখনো সমুদ্রে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।


0 মন্তব্যসমূহ