Header Ads Widget

Responsive Advertisement

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: একতরফা বাধ্যবাধকতা নাকি কৌশলগত ফাঁদ?


 

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: একতরফা বাধ্যবাধকতা নাকি কৌশলগত ফাঁদ?

বিশেষ প্রতিবেদন | ৪ মে, ২০২৬

গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি’ (এআরটি) সই হয়। তবে চুক্তির ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং শর্তাবলি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, এটি মূলত বাংলাদেশের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতার এক দীর্ঘ তালিকা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনেকটা ‘ইচ্ছাধীন’।

‘শ্যাল’ বনাম ‘উইল’: শব্দের মারপ্যাঁচে অসম চুক্তি

চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর শব্দচয়ন। আইনি ভাষায় ‘শ্যাল’ (Shall) অর্থ বাধ্যতামূলক এবং ‘উইল’ (Will) অর্থ ইচ্ছাধীন।

  • পুরো চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি আছে ১৭৯ বার, যার মধ্যে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’ এসেছে ১৩১ বার।

  • বিপরীতে ‘ইউএস শ্যাল’ বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যবাধকতা আছে মাত্র ৬ বার।

  • অন্যদিকে, ইচ্ছাধীন বিষয় বা ‘উইল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ৩ বার।

কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে মার্কিন আধিপত্য

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যকে অগ্রাধিকার দেবে।

  • ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম: আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (FDA) অনুমোদনকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং বাংলাদেশ আলাদা কোনো পরীক্ষা বা শর্ত আরোপ করতে পারবে না।

  • খাদ্য পণ্য: মার্কিন দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রি পণ্যের জন্য ইউএসডিএ (USDA) সনদই যথেষ্ট হবে; বাংলাদেশ কোনো আলাদা কারখানা নিবন্ধন বা অতিরিক্ত মান যাচাই করতে পারবে না।

  • বার্ড ফ্লু সংক্রান্ত শর্ত: যুক্তরাষ্ট্রে বার্ড ফ্লু দেখা দিলেও বাংলাদেশ পুরো অঙ্গরাজ্য থেকে আমদানি বন্ধ করতে পারবে না, কেবল আক্রান্তের ১০ কিমি জোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

মেধাস্বত্ব ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন

বাংলাদেশকে আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে (যেমন- মাদ্রিদ প্রটোকল, পেটেন্ট কো-অপারেশন ট্রিটি, ডব্লিউআইপিও কপিরাইট ট্রিটি) যোগ দিতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া জিআই সুরক্ষার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও মার্কিন স্বার্থের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

শ্রম আইন ও ইপিজেড সংস্কার

শ্রম খাতের ওপর চুক্তিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী:

  • ইউনিয়ন নিবন্ধনের ২০ শতাংশ সদস্যের শর্ত কমাতে হবে।

  • চুক্তি কার্যকর হওয়ার ২ বছরের মধ্যে ইপিজেডগুলোকে শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সেখানে স্বাধীন ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ দিতে হবে।

  • পোশাক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলাগুলো (যেমন ২০২৩ সালের মজুরি আন্দোলনের মামলা) নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার করতে হবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি

  • ডেটা ও সাইবার নিরাপত্তা: মার্কিন ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক কর আরোপ করা যাবে না। সাইবার সেফটি অধ্যাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এনক্রিপ্টেড সেবার ক্ষেত্রে ‘এনক্রিপশন কি’ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দিতে হবে।

  • ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি: ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি অংশ লাইসেন্স ছাড়া ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যাদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, বাংলাদেশকে নিজ আইন অনুযায়ী একই ধরনের ‘সহায়ক ব্যবস্থা’ নিতে হবে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি:

  • বিমা খাত: মার্কিন বিমা কোম্পানিগুলোকে আর তাদের ব্যবসার ৫০ শতাংশ সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দিতে হবে না।

  • বিনিয়োগ: তেল, গ্যাস ও টেলিকম খাতে মার্কিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মালিকানার সীমা শিথিল করতে হবে।

  • শুল্ক: নির্দিষ্ট মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে কমিয়ে ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।

  • বর্তমান অবস্থা ও সমালোচনা

    চুক্তিটি এখনো কার্যকর না হলেও এর আওতায় পণ্য কেনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতিবিদেরা এই চুক্তিকে একতরফা আখ্যা দিয়ে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কঠোর নিয়ম নিতে পারলেও বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা বা অধিকার হারিয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ