ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান? শান্তির পথে তেহরান ও ওয়াশিংটন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ৭ মে, ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে এবার শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। দীর্ঘ দুই মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে সই করতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির মাধ্যমে কেবল যুদ্ধই বন্ধ হবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত 'হরমুজ প্রণালি' আবারও উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।
সমঝোতা স্মারকের মূল ভিত্তি: ১৪ দফা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স-এর তথ্যমতে, এক পাতার এই খসড়া সমঝোতা স্মারকে মোট ১৪টি দফা রয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তৈরি এই খসড়ায় বলা হয়েছে:
যুদ্ধ বিরতি: সমঝোতা সইয়ের সাথে সাথে পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ হবে।
হরমুজ প্রণালি: ৩০ দিনের মধ্যে ইরান এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ তুলে নেবে।
অবরোধ প্রত্যাহার: বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
চূড়ান্ত আলোচনা: সমঝোতা সইয়ের পর ৩০ দিনের মধ্যে দুই দেশ চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য ইসলামাবাদ বা জেনেভায় আলোচনায় বসবে।
ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত
সমঝোতার এই ইঙ্গিত আরও জোরালো হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বার্তায়। তিনি তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ জানিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় তিনি হরমুজ প্রণালিতে চালানো ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান আপাতত স্থগিত করছেন। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে আরও বড় পরিসরে হামলা চালানো হবে।
বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ধস
শান্তির এই সংকেত পাওয়ার পরপরই বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় যা ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আবার স্থিতিশীল হবে।
পরমাণু ইস্যু ও জব্দকৃত অর্থ
সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে: ১. ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। ২. যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা ইরানের দুই হাজার কোটি ডলার (২০ বিলিয়ন) ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কত বছরের জন্য স্থগিত থাকবে (৫ বছর নাকি ২০ বছর), তা নিয়ে এখনো দরকষাকষি চলছে।
সংকটের অন্য পিঠ: ইসরায়েল ও লেবানন পরিস্থিতি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পথে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শান্ত নয়। ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলের একটি জরিপে দেখা গেছে, সেদেশের ৬২ শতাংশ মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও নতুন লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রস্তুত করার কথা জানিয়েছেন।
একনজরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র:
প্রাণহানি: ৬,০০০+ (এখন পর্যন্ত)।
জাহাজে হামলা: ২৬টি (হরমুজ ও আশপাশে)।
তেলের দাম: ১২০ ডলার থেকে নেমে বর্তমানে <১০০ ডলার।
পকেট নিউজ-এর বিশ্লেষণ: সমঝোতা স্মারকে সই হলেও হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক জাহাজ চলাচলে আস্থা ফিরতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে এটি বাস্তবায়িত হলে গত দুই দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এটিই হবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা ও রয়টার্স

0 মন্তব্যসমূহ