নতুন তরঙ্গ নিলামে মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নয়নের আশা, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২১ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের বহু গ্রামীণ, পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে এখনো মোবাইল ফোনে কথা বলতে কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে ঘরের বাইরে যেতে হয়। কোথাও উঠানে দাঁড়াতে হয়, কোথাও রাস্তার ধারে যেতে হয়, আবার কোথাও গাছে উঠে নেটওয়ার্ক ধরার ঘটনাও ঘটছে। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি দূর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
মোবাইল অপারেটরদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কম কম্পাঙ্কের বা ‘লোয়ার-ব্যান্ড’ তরঙ্গ নিলামের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনা সফল হলে দেশের গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
কেন দুর্বল থাকে নেটওয়ার্ক?
মোবাইল ফোনের সিগন্যাল মূলত বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে চলাচল করে। বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক উচ্চ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দ্রুতগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করলেও দেয়াল, ছাদ কিংবা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা সহজে অতিক্রম করতে পারে না।
ফলে টাওয়ার কাছাকাছি থাকলেও ভবনের ভেতরে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকা, সীমান্ত অঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামাঞ্চলে এ সমস্যা আরও প্রকট।
সম্প্রতি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে এক স্কুলশিক্ষকের গাছে উঠে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটি দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
কী সুবিধা দেবে নতুন তরঙ্গ?
বিটিআরসি এবার ৮৮০-৮৮৮.৪ এবং ৯২৫-৯৩৩.৪ মেগাহার্টজ রেঞ্জের ‘এক্সটেন্ডেড জিএসএম (ইজিএসএম)’ ব্যান্ড নিলামের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের লোয়ার-ব্যান্ড স্পেকট্রামের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—
সিগন্যাল অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়
দেয়াল ও ভবনের ভেতরে সহজে প্রবেশ করতে পারে
কম টাওয়ার দিয়েই বৃহৎ এলাকা কভার করা সম্ভব
গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে সেবার মান বাড়ে
প্রায় সব ধরনের মোবাইল হ্যান্ডসেট এই প্রযুক্তি সমর্থন করে
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও গ্রামীণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে এ ধরনের তরঙ্গকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
নিলাম কবে হতে পারে?
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, একই স্পেকট্রামের জন্য একাধিক অপারেটর আবেদন করায় প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমে তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে সরকারের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই নিলাম আয়োজন সম্ভব।
বর্তমানে রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক ৩.৪ মেগাহার্টজ ব্লকের জন্য আবেদন করেছে। অন্যদিকে গ্রামীণফোন ইতোমধ্যে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার শুরু করেছে এবং টেলিটকও ওই ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দ পেয়েছে।
আরও পড়ুন
দুই ছেলের নামে ইউনিয়নের নামকরণ বিতর্ক: প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ
বিস্তারিত পড়ুন এখানেসীমান্ত এলাকায় রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন উদ্যোগের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বাধা রয়েছে। বিটিআরসির কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের কারণে সংকেতের মধ্যে হস্তক্ষেপ (ইন্টারফেরেন্স) হচ্ছে।
এর ফলে—
রংপুর
ময়মনসিংহ
সিলেট
কুমিল্লা
চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী অঞ্চল
বিশেষভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত এলাকায় কার্যকর সমাধানের জন্য প্রতিবেশী দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
তরঙ্গ পেলেই কি সমস্যার সমাধান?
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তরঙ্গ বরাদ্দ দিলেই নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধান হবে না।
নতুন স্পেকট্রাম কার্যকর করতে অপারেটরদের—
নতুন বেজ স্টেশন স্থাপন,
বিদ্যমান টাওয়ার আধুনিকায়ন,
ব্যাকহল নেটওয়ার্ক উন্নয়ন,
অতিরিক্ত বিনিয়োগ
করতে হবে।
তবে ইতোমধ্যে অপারেটরদের ইজিএসএম অবকাঠামো থাকায় নতুন তরঙ্গ চালু করতে তুলনামূলক কম সময় লাগতে পারে। বাংলালিংক জানিয়েছে, নিলাম দ্রুত সম্পন্ন হলে চলতি বছরের মধ্যেই নতুন সেবা চালু করা সম্ভব।
ডিজিটাল বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশে ১৮ কোটিরও বেশি মোবাইল গ্রাহক রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যবসা ও সরকারি সেবা গ্রহণে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন লোয়ার-ব্যান্ড স্পেকট্রাম কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে শুধু কল ড্রপ বা দুর্বল সিগন্যালের সমস্যা কমবে না, বরং দেশের ডিজিটাল বৈষম্যও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এতে পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষও উন্নত যোগাযোগ সুবিধার আওতায় আসবে।
আরও পড়ুন
তবে এর জন্য দ্রুত নিলাম, অপারেটরদের বিনিয়োগ এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ