ট্রাম্পের ঘোষণা: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত; কূটনীতির বদলে কঠোর অবস্থানে হোয়াইট হাউস
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ| ৮ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরানের সঙ্গে আর কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতায় আগ্রহী নয় ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বকে ‘জঘন্য’, ‘অসুস্থ’, ‘নৃশংস’ এবং ‘মিথ্যাবাদী’ বলে কঠোর মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক হামলার জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে।
যুদ্ধবিরতি শেষ, আলোচনায় অনাগ্রহ ট্রাম্পের
ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তাঁর মতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত শেষ। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে নতুন করে কোনো আলোচনায় বসার প্রয়োজন দেখছেন না।
ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং তারা সুযোগ পেলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করত। তাঁর দাবি, ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব নয়; বরং তা সময়ের অপচয়।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি করলে তা মেনে চলে, কিন্তু ইরান বারবার সমঝোতা অস্বীকার করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
সেন্টকমের বড় সামরিক অভিযান
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে ইরানের ৮০টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল—
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর ৬০টির বেশি নৌযান।
উপকূলীয় রাডার স্থাপনা।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলার দাবি
মার্কিন হামলার পর ইরান দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। তেহরান দাবি করেছে, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে যুদ্ধবিরতির "গুরুতর লঙ্ঘন" হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, এর জবাব দেওয়া তাদের অধিকার।
এদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, হামলার সময় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
ইরান পুনরায় স্পষ্ট করেছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে।
তার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক হস্তক্ষেপ।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা।
দক্ষিণ ইরানে সামরিক হামলা।
লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানে সমর্থন।
তার মতে, এসব পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতির ভিত্তি নষ্ট করেছে।
আরও পড়ুন
তাজমহল ঘিরে নতুন বিতর্ক: মন্দিরের দাবিতে জরিপ চাইলেন আবেদনকারী, হাইকোর্টের নোটিশে নতুন আলোচনার সূচনা
বিস্তারিত পড়ুন এখানেতেলবাজারে নতুন অস্থিরতা
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে সেখানে সংঘাত বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যদিও ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর আলোচক দল—যার মধ্যে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার রয়েছেন—সংলাপ চালিয়ে যেতে আগ্রহী, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁরই হবে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা তিনি দেখছেন না।
অন্যদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে উসকানিমূলক বলে অভিহিত করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উভয় পক্ষ যদি সামরিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রাখে, তাহলে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে মধ্যপ্রাচ্য আরও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ